মঙ্গলবার | ২৯ মার্চ ২০১১ | ১৫ চৈত্র ১৪১৭ | ২৩ রবিউস সানি ১৪৩২
সার্চ
আর্কাইভ
দিন :
মাস :
সাল :
উপসম্পাদকীয়
উপসম্পাদকীয়-এর আর্কাইভ
এক বীর সেনানীর কথা
তানজিনা হক বিয়াস
মার্চ ১৯৭১। সেদিন ছিল ১৯ তারিখ। কুমিল্লা সেনানিবাসের উচ্চপদস্থ সেনা অফিসারদের (পাকসেনাসহ) জরুরি কনফারেন্স চলছে। বিষয়_ বাংলাদেশের বিদ্রোহী যুবসমাজকে সমূলে উৎখাত করা। ব্যাপারটা একেবারেই মেনে নিতে পারলেন না লে. কর্নেল জাহাঙ্গীর। দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তিনি রুখে দাঁড়ালেন এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। আর সেদিন থেকেই কনফারেন্সগুলোতে তার উপস্থিতি নিষিদ্ধ করা হলো।
২৫ মার্চ, সেনা ক্লাবে সন্ধ্যায় এসেই অস্বাভাবিক একটা পরিবেশ আঁচ করতে পারলেন তিনি। ক্লাব ত্যাগ করতে চাইলেন, বাধা দেওয়া হলো তাকে। হেডকোয়ার্টারে ডাকা হলো ২৬ মার্চ। জিজ্ঞাসা করা হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে কোনো জানাশোনা আছে কি-না? ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা অস্বীকার করলেও তিনি বললেন, তিনি নীতিগতভাবে তাদের সমর্থন করেন। ২৭ মার্চ সকালে অর্ডার পেলেন, ইউনিটের সব অস্ত্র জমা দিতে হবে। তিনি সামান্য কিছু অস্ত্র জমা দিয়ে বাকিগুলো লুকিয়ে ফেললেন। ইউনিটের সদস্যদের ডেকে বললেন 'মৃত্যু যদি অনিবার্য হয়, তবে তোমরা তোমাদের হাতের শেষ অস্ত্রগুলো ব্যবহার করে মৃত্যুবরণ কর, কিন্তু আত্মসমর্পণ করে নিজেদের ও দেশকে কলঙ্কিত করো না।' ২৯ মার্চ, দুপুর বেলা। এক পশ্চিমা সেপাই লুকিয়ে তার বাসায় আসে, আতঙ্কগ্রস্ত কণ্ঠে বলে, 'কর্নেল সাহেবকে পালিয়ে যেতে বলুন, সেনাবাহিনীর সব বাঙালি অফিসার ও সেপাইদের মেরে ফেলার হুকুম হয়েছে।' তিনি তখন বাসায় ছিলেন না। বাসায় আসতেই তিনি সব শুনলেন। ধীর কণ্ঠে বললেন 'এতজন বাঙালি সেপাই, তাদের ছেড়ে আমি কেমন করে পালাব? ওদেরকে আমি পালানোর জন্য বলেছি; কিন্তু ওরা আমার জন্য পালায়নি। ওদেরকে একলা এই বিপদের মাঝে রেখে আমি কি করে পালাব?' দু'বার তিনি অফিসে যেতে চেয়ে ব্যর্থ হলেন, ফোন দিলেন অফিসে, কিন্তু তার মুখ হঠাৎ কঠিন হয়ে গেল, বললেন 'ওরা যদি তোমাদের ওপর মেশিনগান ব্যবহার করে তোমরা চুপ করে দাঁড়িয়ে মার খেও না, তোমাদের হাতে যে অস্ত্র আছে তা দিয়ে যুদ্ধ করো। দেশের জন্য যুদ্ধ করে শহীদ হওয়ার চাইতে বড় গৌরব আর কিছুই নাই।'
ওই দিন (২৯ মার্চ) ৪০ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের বীর সৈনিকরা ইউনিট অধিনায়ক লে. কর্নেল জাহাঙ্গীরের ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধ করলেন এবং তিনজন বাদে সব সেনা (৪৭ জন) শহীদ হলেন। এই যুদ্ধে পাকবাহিনীর ১০০ সৈন্যও মারা যায়। ৩০ মার্চ, তখন সকাল পৌনে সাতটা। এক অফিসারের বাসায় আশ্রিত তিনি ও তার পরিবার। দু'জন পাকিস্তানি সেপাই তাকে নিয়ে যেতে এসেছে। তিনি বুঝতে পারলেন এটাই আপনজনদের সঙ্গে তার শেষ দেখা। তারপর দুঃসহ দিনের শুরু, আরও কয়েকটি বাঙালি পরিবারসহ কুমিল্লা ইস্পাহানী স্কুলে বন্দি ছোট দুই ছেলে আর কয়েক মাসের শিশুকন্যাকে নিয়ে। খাবার নেই, পানি নেই, দুধের শিশু কাঁদছে। কোথাও স্বামীর খোঁজ নেই। এমনি একদিন, পাকবাহিনীর কর্নেল ইয়াকুব মালিক সেখানে এলে, বেগম জাহাঙ্গীর সাহস করে স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করলেন। সেই খুনি শীতল গলায় বলে, 'জাহাঙ্গীর একজন বিদ্রোহী, সে পাকিস্তানিদের ধ্বংস কামনা করত। এমনকি ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড়িয়েও সে এই মনোভাব ব্যক্ত করেছে। মৃত্যুই এসব বিদ্রোহীর যোগ্যতম শাস্তি।'
লে. কর্নেল জাহাঙ্গীর, রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার ডাক্তার আবদুল কাদের আর জাহানারা বেগমের প্রথম সন্তান। জন্ম ১৯৩১ সালের মে, ১৯৪৪ সালে ম্যাট্রিক ও ১৯৪৬ সালে আইএসসি পাস করেন। দুটোতেই প্রথম বিভাগে পাস করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে পাস করে আর্মি মেডিকেল কোরে যোগদান করেন।
সাহসী, মেধাবী, দেশপ্রেমিক এই চিকিৎসক ৩০ মার্চ ১৯৭১ নিখোঁজ হন। মার্চ ১৯৭২-এ কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি গণকবর থেকে তুলে কুমিল্লা সিএমএইচের সামনে তাকে সমাহিত করা হয়। লে. কর্নেল জাহাঙ্গীরসহ সব শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি আমাদের গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা। তবুও স্বাধীনতার চার দশক পরে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসে, এখনও পাকিস্তানের দোসর হায়েনারা ঘুরে বেড়ায় স্বাধীন ভূমিতে। বিচারের জন্য আর কতকাল অপেক্ষা করব আমরা! স্বজন হারানো শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের বুকের রক্তক্ষরণই বা বন্ধ হবে কবে!
 
 
 
সম্পাদক: গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ.কে.আজাদ, ১৩৬, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
ফোন : ৮৮৭০১৭৯ - ৮৫, ৮৮৭০১৯২,৮৮৭০১৯৫ ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭০১৯৬৩৫৭৪ বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
ই-মেইল :
info@samakal.com.bd . . . .
Powered By:orangebd
Flag Counter